গত আর্টিকেলে আমি সরকারি চাকরিতে
ইঞ্জিনিয়ারদের সুযোগ ও ক্ষেত্রগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। আজ প্রাইভেট সেক্টরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। সরকারি চাকরি যদি হয়
প্রেস্টিজ, তবে প্রাইভেট সেক্টর হলো
ডায়নামিজম এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টের বিশাল ক্ষেত্র। বিশেষ করে মেকানিক্যাল, ইইই বা আইপিই ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য দেশের প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে কাজের
পরিধি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।
আজকের এই লেখায় আমি বাংলাদেশের প্রধান
৫টি প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর—অটোমোবাইল, ফার্মাসিউটিক্যাল, সিমেন্ট, স্টিল এবং অয়েল অ্যান্ড গ্যাস—নিয়ে একটি সামগ্রিক ও টেকনিক্যাল বিশ্লেষণ
তুলে ধরছি।
১. অটোমোবাইল সেক্টরঃ অ্যাসেম্বলিং ও
ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের নতুন যুগ
ক্যারিয়ারের শুরুতে মেকানিক্যাল
ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে আমাদের অনেকেরই ধারণা থাকে শুধু গাড়ি মেরামত। কিন্তু বাস্তবতা
হলো, দক্ষিণ এশিয়ার ৩য় বৃহত্তম অটোমোবাইল সেক্টর এখন বাংলাদেশের। দেশে ব্যবহৃত
গাড়ির প্রায় ৮০% জাপান থেকে রিকন্ডিশন্ড অবস্থায় আমদানি করা হলেও, বর্তমানে লোকাল অ্যাসেম্বলিং বা সংযোজন শিল্পে এক বিশাল বিপ্লব ঘটে গেছে।
বর্তমান বাজার ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল
ল্যান্ডস্কেপঃ দেশে এখন Mitsubishi (জাপান), Proton (মালয়েশিয়া), Hino (জাপান) এবং Tata (ইন্ডিয়া)-র মতো
জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর প্রাইভেট কার ও ভারী যানবাহন দেশীয় প্লান্টে অ্যাসেম্বল করা
হচ্ছে। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এই সেক্টরের পাইওনিয়ার হলেও, বর্তমানে বেশ কিছু বড়
প্রাইভেট গ্রুপ এবং জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি লিড দিচ্ছে। যেমনঃ
- PHP
Group + Proton (Malaysia/UK): প্রাইভেট কার অ্যাসেম্বলিতে বড় নাম।
- Walton
+ Agate Group: নিজস্ব
প্রযুক্তিতে গাড়ি তৈরির প্রচেষ্টায় এগিয়ে।
- ACI
Motors + Foton (China): কমার্শিয়াল ভেহিকল সেগমেন্টে।
- Runner
Motors + Eicher: ট্রাক ও ভারী যান।
- Nitol-Niloy
+ Hero, ACI + Yamaha, Honda + BSEC: মোটরসাইকেল সেগমেন্টে ডোমেস্টিক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
একজন ইঞ্জিনিয়ারের কাজের ক্ষেত্র (Scope of Work): অটোমোবাইল সেক্টরে ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ মূলত ৫টি কোর এরিয়াতে বিভক্তঃ ১. সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট (SCM): গাড়ির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বিদেশ থেকে পার্টস সোর্স করা এবং লজিস্টিকস
মেইনটেইন করা। ২. প্রোডাকশন লাইন: ওয়েল্ডিং, মেটাল প্রেসিং, পেইন্টিং শপ এবং ফাইনাল
অ্যাসেম্বলি লাইন অপারেট করা। ৩. কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও R&D: একটি প্রোটন
গাড়িতে প্রায় ৮,৩৩২টি পার্টস থাকে, যার মধ্যে প্রায় ৮০০টি পার্টস (যেমন- ইঞ্জিন অ্যাসেম্বলি, গিয়ার বক্স, এক্সেল, সাসপেনশন, ড্যাশবোর্ড প্যানেল ইত্যাদি) দেশেই
সংযোজন করা হয়। এই প্রিসিশন বা সূক্ষ্মতা নিশ্চিত করাই ইঞ্জিনিয়ারের কাজ। ৪. সার্ভিস ও মেইনটেইনেন্স: আফটার সেলস সার্ভিস এবং প্লান্টের ইউটিলিটি মেশিনারিজ রক্ষণাবেক্ষণ।
SWOT অ্যানালাইসিস করলে দেখা যায়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যক্তিগত ও কমার্শিয়াল গাড়ির চাহিদা
বাড়ছে,
যা এই সেক্টরের জন্য পজিটিভ। তবে দক্ষ জনবলের অভাব এবং
পলিসিগত কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
২. ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরঃ হাই-টেক ও
প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল বা ঔষধ
শিল্প এখন বিশ্বমানের এবং আমরা এখন ঔষধ আমদানিকারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে
পরিণত হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য এটি অন্যতম পরিচ্ছন্ন এবং হাই-টেক কাজের ক্ষেত্র।
ইঞ্জিনিয়ারদের ভূমিকাঃ অনেকে ভাবেন ফার্মা কোম্পানিতে শুধু কেমিস্ট বা ফার্মাসিস্টদের কাজ। ভুল!
ফার্মা প্লান্টের মেরুদণ্ড হলো ইঞ্জিনিয়াররা।
- HVAC সিস্টেম: ঔষধ তৈরির জন্য আবহাওয়া বা বাতাস নিয়ন্ত্রণ (Temperature
& Humidity Control) অত্যন্ত জরুরি।
এই বিশাল HVAC সিস্টেম মেইনটেইন করেন
মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা।
- ইউটিলিটি ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট: WFI (Water
for Injection) প্লান্ট, বয়লার এবং কম্প্রেসড এয়ার সিস্টেম পরিচালনা।
- মেশিন মেইনটেইনেন্স: ব্লিস্টার প্যাকেজিং মেশিন, ফিলিং মেশিনসহ অটোমেটেড রোবোটিক্স মেশিনারিজ
রক্ষণাবেক্ষণ।
স্কয়ার, বেক্সিমকো, ইনসেপ্টা বা রেনাটার মতো কোম্পানিগুলোতে
ইঞ্জিনিয়ারদের কাজের পরিবেশ অত্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড এবং প্রফেশনাল।
৩. সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিঃ ভারী শিল্পের
চ্যালেঞ্জ
দেশের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট
(পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, ফ্লাইওভার) এর কারণে সিমেন্টের চাহিদা আকাশচুম্বী। লাফার্জ হোলসিম, শাহ সিমেন্ট, সেভেন রিংস, প্রিমিয়ার সিমেন্ট—এরা প্রত্যেকেই ভারী মেশিনারিজ নির্ভর ইন্ডাস্ট্রি।
কাজের ধরণঃ সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি হলো "কন্টিনিউয়াস প্রসেস" ইন্ডাস্ট্রি। এখানে
ইঞ্জিনিয়ারদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো 'জিরো ডাউনটাইম' নিশ্চিত করা।
- ক্লিংকার ক্রাশার, বল মিল (Ball Mill), রোটারি
কিলন (Rotary Kiln) এর মতো দানবীয়
মেশিনের মেইনটেইনেন্স।
- কনভেয়ার বেল্ট সিস্টেম এবং প্যাকিং প্লান্টের অটোমেশন
দেখাশোনা। ধুলোবালি ও ভারী
শব্দের মাঝে যারা চ্যালেঞ্জিং কাজ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি আদর্শ জায়গা।
৪. স্টিল ইন্ডাস্ট্রিঃ এক্সট্রিম
ইঞ্জিনিয়ারিং
বিএসআরএম (BSRM), কেএসআরএম (KSRM), জিপিএইচ ইস্পাত, বা আবুল খায়ের স্টিল—এরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। স্টিল মিলের পরিবেশ অত্যন্ত রাফ অ্যান্ড
টাফ।
টেকনিক্যাল দিকঃ
- মেল্টিং শপ: ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস বা ইন্ডাকশন ফার্নেসে হাজার
ডিগ্রি তাপমাত্রায় লোহা গলানো হয়। এখানে পাওয়ার সিস্টেম এবং কুলিং সিস্টেম
সচল রাখা ইঞ্জিনিয়ারদের বড় দায়িত্ব।
- রোলিং মিল: গলিত লোহা থেকে বিলেট এবং রড তৈরির অটোমেটেড প্রসেস কন্ট্রোল করা।
- হাইড্রোলিক সিস্টেম এবং ভারী মেকানিক্যাল গিয়ারবক্স
নিয়ে কাজ করার অবারিত সুযোগ রয়েছে এখানে।
৫. তেল, গ্যাস ও পাওয়ার সেক্টর (প্রাইভেট)
সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বর্তমানে
প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (IPP) এবং রিফাইনারিগুলো ইঞ্জিনিয়ারদের বড় কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। সামিট, ইউনাইটেড, ওরিয়ন গ্রুপের মতো কোম্পানিগুলো এর
উদাহরণ।
কাজের সুযোগঃ
- পাওয়ার প্লান্ট: গ্যাস বা HFO ভিত্তিক ইঞ্জিন (যেমন Wärtsilä, Caterpillar) বা টারবাইন অপারেশন ও মেইনটেইনেন্স (O&M)।
- LPG ও রিফাইনারি: বসুন্ধরা, ওমেরা, ফ্রেশ এর মতো কোম্পানিগুলোর এলপিজি
প্লান্ট এবং কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্লান্টে প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেফটি
মেইনটেইনেন্স।
শেষ কথা
প্রাইভেট সেক্টরে কাজের সুযোগের কোনো
অভাব নেই,
অভাব শুধু সঠিক স্কিলসেট এবং মানসিকতার। অটোমোবাইল থেকে
শুরু করে স্টিল মিল—প্রতিটি সেক্টরেই এখন মডার্ন টেকনোলজি ব্যবহৃত হচ্ছে। একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিজেকে
এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যেন আপনি শুধু মেশিন অপারেটর না হয়ে, পুরো সিস্টেমের সমাধানদাতা হতে পারেন।
সরকারি বা বেসরকারি—যেকোনো সেক্টরেই সফল হতে হলে টেকনিক্যাল
নলেজের পাশাপাশি প্রফেশনালিজম ও অ্যাডাপ্টেবিলিটির কোনো বিকল্প নেই।
ধন্যবাদ।
টিটু নন্দির ব্লগ পোস্টঃ
১ম পর্ব (অটোমোবাইল): http://bit.ly/2q5ObzC
২য় পর্ব (ফার্মাসিউটিক্যাল): http://bit.ly/32MB0kb
৩য় পর্ব (সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি: http://bit.ly/2OkAvc6
৪র্থ পর্ব (স্টিল ইন্ডাস্ট্রি): http://bit.ly/2KmRWaL
৫ম পর্ব(তেল ও গ্যাস):http://bit.ly/2OBAZdU


No comments:
Post a Comment
Thanks for comment stay with us.