নবায়নযোগ্য জ্বালানি: কাগজে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ে, কিন্তু বাস্তবে কেন এগোচ্ছে না বাংলাদেশ? - EduTech

Latest

EduTech

Learning Today...Leading Tomorrow

Thursday, January 8, 2026

নবায়নযোগ্য জ্বালানি: কাগজে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ে, কিন্তু বাস্তবে কেন এগোচ্ছে না বাংলাদেশ?


এক দশক ধরে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা 'সবুজ বিদ্যুৎ' নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। সরকারের নথিপত্রে একের পর এক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার সেই অনুপাতে বাড়ছে না। আমাদের আজকের ব্লগে জানব, কেন এই স্থবিরতা এবং এর পেছনের কারণগুলো কী।

১. লক্ষ্য বনাম অর্জন: পরিসংখ্যান কী বলছে?

সরকারের পরিকল্পনা ছিল ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এরপর ২০২৫ সাল পর্যন্ত নতুন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলেও, বর্তমানে অর্জন মাত্র ৪.৬২ শতাংশ

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে:

  • দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা: ২৮,৬১৬ মেগাওয়াট

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা: ১,৩১৪ মেগাওয়াট (যা মোট সক্ষমতার খুব সামান্য অংশ)

  • এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ৭৮%, পানিবিদ্যুৎ ১৭% এবং বায়ুবিদ্যুৎ ৫%।

২. কেন এই ধীরগতি?

বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার অভাবেই মূলত এই খাতটি পিছিয়ে আছে। ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। অবাক করা বিষয় হলো, এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩.৩ শতাংশ

মূল কারণগুলো হলো:

  • জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা: গত দেড় দশকে জীবাশ্ম জ্বালানি (তেল, গ্যাস, কয়লা) ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।

  • জমির স্বল্পতা: সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিশাল জমির প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

  • আমদানি শুল্ক ও নীতিসহায়তা: সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক (প্রায় ২৮-২৯%) এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করেছে।

৩. অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ ও নতুন সম্ভাবনা

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত সরকারের আমলে করা ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র বাতিল করেছে, যার বেশিরভাগই ছিল বিনা দরপত্রে করা। নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়ায় বিদ্যুতের দাম গড়ে ২১ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

তবে বিনিয়োগকারীরা বলছেন, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন এবং ব্যবসায়িক আস্থার সংকটের কারণে তারা এখনো দ্বিধায় আছেন।

৪. ছাদ যখন বিদ্যুৎকেন্দ্র: অপার সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জমির সংকট কাটাতে ‘রূফটপ সোলার’ বা ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন গেম চেঞ্জার হতে পারে। সরকারি হিসাবমতে, শুধু সরকারি স্থাপনার ছাদ ব্যবহার করেই ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

ইতিমধ্যে ৬টি সরকারি বিভাগের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, কিন্তু এখানেও আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি লক্ষণীয়। অথচ আইইইএফএ (IEEFA)-এর মতে, ছাদের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে বছরে হাজার কোটি টাকার তেল সাশ্রয় করা সম্ভব।

৫. প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমরা কোথায়?

শ্রীলঙ্কায় যেখানে ৭৫ শতাংশ এবং ভারতে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো ৫ শতাংশের নিচে আটকে আছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও প্রায় চার গুণ বেশি।

উপসংহার

কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না, যদি না বাস্তবে সঠিক বিনিয়োগ এবং নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা যায়। বিশ্ববাজারে সোলার প্যানেলের দাম কমছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এবং উচ্চ শুল্ক কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশও সবুজ জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে।

আপনার মতামত কী?

আপনি কি মনে করেন ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার প্যানেল বসানো বাধ্যতামূলক করা উচিত? কমেন্টে জানান।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো (০৮ জানুয়ারি ২০২৬)

No comments:

Post a Comment

Thanks for comment stay with us.